অঙ্কের খোঁজে স্বপ্নের যাত্রা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
অঙ্কের খোঁজে স্বপ্নের যাত্রা

রাজধানীর আসাদ গেটে সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল প্রাঙ্গণে গত শনিবার সকালটা ছিল অন্য রকম। শীতের সকালের নরম আলোয় হাজারো কচিকণ্ঠ মিলিত হয়েছিল সেখানে। স্কুলে ঢুকতেই চোখে পড়ে হাতে খাতা, কলম, প্রবেশপত্র আর স্বপ্ন নিয়ে আসা শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সারি। মুখে ছিল উৎকণ্ঠা, চোখে ছিল প্রত্যাশা। গণিতেই যেন তারা খুঁজছিল স্বপ্নের যাত্রা।


‘গণিত শেখো স্বপ্ন দেখো’ স্লোগান সামনে রেখে শুরু হয়েছে ‘ডাচ্-বাংলা ব্যাংক-প্রথম আলো গণিত উৎসব ২০২৬’ ঢাকা আঞ্চলিক পর্ব। গত শনিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দিনব্যাপী এ উৎসবে অংশ নেয় ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন জেলার ৬ হাজার ৩৩৫ শিক্ষার্থী।


উৎসব শুরু হয় সকাল ৯টায়। জাতীয় সংগীতের সুরে সুরে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন স্কুলের অধ্যক্ষ ব্রাদার লিও প্যারেরা, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা উত্তোলন করেন অলিম্পিয়াড কমিটির সহসভাপতি অধ্যাপক আবদুল হাকিম খান এবং আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা উত্তোলন করেন ডাচ্-বাংলা ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম। এরপর ব্রাদার লিও প্যারেরা গণিত উৎসবের উদ্বোধন ঘোষণা করে উপস্থিত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের শুভেচ্ছা জানান। জাতীয় সংগীত পরিবেশন করে সেন্ট যোসেফ স্কুলের শিক্ষার্থীরা।


এ উৎসব শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি হয়ে উঠেছে হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন দেখার এক বিশাল মঞ্চ। রাজধানী ঢাকা ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদী থেকে ছুটে এসেছে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকেরা। অনেকেই বললেন, ভালো ফলের চেয়েও অংশগ্রহণটাই বড়। কারণ, এই অংশগ্রহণই একদিন সন্তানের ভেতরের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলবে।


পরীক্ষা চলছে, তবু এসেছে


নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজ থেকে এসেছে যমজ ভাই অনিমেশ শীল ও অনিরুদ্ধ শীল। দুজনেই এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী। তাদের টেস্ট পরীক্ষা চলছে, তবু এসেছে গণিত উৎসবে।


তাদের মা গৌরী রানী দাস বলেন, প্রচণ্ড আগ্রহের কারণেই তিনি ছেলেদের নিয়ে এসেছেন। পরীক্ষা শেষে ছেলেরা তাঁকে জানিয়েছে, এই অভিজ্ঞতা তাদের আগামী এইচএসসি ও বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় এগিয়ে রাখবে।


সকাল ৯টায় উদ্বোধনী পর্বের পর দিনব্যাপী তিন ধাপে পরীক্ষাপর্ব চলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। সকাল ১০টা থেকে বেলা ১১টা প্রাইমারি ক্যাটাগরি, দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট থেকে বেলা ১টা ৩০ মিনিট জুনিয়র ক্যাটাগরি এবং বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সেকেন্ডারি ও হায়ার সেকেন্ডারি ক্যাটাগরি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।


আয়োজকেরা জানান, ঢাকা আঞ্চলিক পর্বের বিজয়ীদের ফলাফল গণিত অলিম্পিয়াডের ওয়েবসাইটে (https:// matholympiad.org.bd/) প্রকাশ করা হয়।


গণিত অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠানস্থলে অংশ নেয় প্রথমা প্রকাশন, আদর্শ, তাম্রলিপি, স্বপ্ন ’৭১, ল্যাববাংলা, তৌফিক প্রকাশন, দ্বিমিক, রকমারি ডটকম, অন্যরকম বিজ্ঞানবাক্স, বাংলার ম্যাথ। উৎসবে প্রাথমিক চিকিৎসাসহায়তা দিয়েছে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল লিমিটেড।


চলতি বছর গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নেওয়ার জন্য সারা দেশ থেকে অনলাইনে ৫১ হাজার ৫৩২ শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছে। নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রথমে ‘অনলাইন বাছাই অলিম্পিয়াড’ অনুষ্ঠিত হয় এবং বাছাই অলিম্পিয়াডের বিজয়ীদের নিয়ে এখন ১২টি শহরে ‘আঞ্চলিক গণিত উৎসব’ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।


সব আঞ্চলিক গণিত উৎসবের বিজয়ীদের নিয়ে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় গণিত উৎসব ২০২৬।


প্রাণের উৎসব


গণিত উৎসব এখন শিক্ষার্থীদের প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন ডাচ্-বাংলা ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এই অলিম্পিয়াড তরুণ শিক্ষার্থীদের গণিতের প্রতি আরও আকৃষ্ট করে তুলবে। আগামী জুলাই মাসে অনুষ্ঠিতব্য ৬৭তম আন্তর্জাতিক গণিত প্রতিযোগিতায় তোমরা আরও ভালো ফল অর্জন করে দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনবে। আর সেদিনই হবে আমাদের সব চেষ্টার সার্থকতা।’


শিক্ষার্থীদের গণিত শেখা ও গণিত নিয়ে স্বপ্ন দেখার আহ্বান জানান গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সহসভাপতি অধ্যাপক আবদুল হাকিম খান। তিনি বলেন, ‘গণিত বিজ্ঞানের ভাষা, গণিত টেকনোলজির ভাষা।... আমার অনুরোধ থাকবে, তোমরা যখন বড় হবে, তখন গণিত নিয়ে স্বপ্ন দেখবে, গণিতের প্রয়োগ দেখবে ও সেই স্বপ্ন বিস্তার করবে।’


প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক বলেন, আজকের এ প্রতিযোগিতা একটি উৎসব। এ উৎসবে কেউ ভালো করতে পারে, কেউ ভালো না-ও করতে পারে। তবে ভবিষ্যতে সবাই ভালো করবে।


নিজের কাজ ঠিকমতো করাকে প্রকৃত দেশপ্রেম বলে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সাধারণ সম্পাদক মুনির হাসান।


সব শিক্ষার্থীর অংশ নেওয়া উচিত


ডাচ্‌–বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের পৃষ্ঠপোষকতায় ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি এ উৎসবের আয়োজন করেছে। ইতিমধ্যে প্রতিযোগিতাটি দেশের শিক্ষার্থী-অভিভাকদের কাছে মেধা যাচাইয়ের সুযোগে পরিণত হয়েছে।


গতকাল গণিত উৎসবে অংশ নিতে আসে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহির ওয়াসেফ। গণিত উৎসবে ছেলের অংশ নেওয়ার কারণ উল্লেখ করে এই শিক্ষার্থীর মা মাশরেকা ইয়াসমিন বলেন, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর এই প্রতিযোগীতায় অংশ নেওয়া উচিত।


গতকাল ঢাকা আঞ্চলিক পর্বের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন, রাজিয়া বেগম, শাহাদাত উল্লাহ খান ও অ্যাসোসিয়েশন ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ফারজানা আলম। এ ছাড়া দুপুরে গণিত উৎসব পরিদর্শন করেন বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ।


Written by: Abul Hasan
Published at: Mon, Jan 26, 2026 5:00 PM
Category : BdMO 2026
Share with others